• রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি সংকট :

সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট জনগণ

বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি সংকট :

সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট জনগণ

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

আজকের আধুনিক যুগে গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি হলো জীবন-নির্বাহের এক অপরিহার্য ও অন্যতম প্রধান জীবন-প্রবাহ। সাম্রাজ্যবাদীরা, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা ও তাদের দালাল বড় বুর্জোয়া শ্রেণি নিজেদের মুনাফার স্বার্থে তাকে আরো ব্যাপক করে তুলেছে। এ অবস্থায় যখন দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, তখন বুঝতে হবে দেশ ও জনগণের এই শত্রুরা তাদের অর্থনৈতিক নীতি দ্বারা দেশকে সংকটের কোন গহ্বরে নিয়ে ফেলেছে। 

গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে, চালু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়া এবং এ সবের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনগণের জীবন-যাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবহণ, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, এবং হাজার হাজার শ্রমিক-শ্রমজীবী জনগণ বেকার হচ্ছেন, কৃষকের ফসল উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এ অবস্থার জন্য তারা একে অন্যকে দায়ী করছে। জামাত-এনসিপি এ সুযোগে বিএনপি সরকারের বিরোধিতা করে নিজেদের ক্ষমতা-দখলের ষড়যন্ত্র আরো পাকিয়ে তোলার মওকা পাচ্ছে। বিএনপি অতীত আওয়ামী সরকারের উপর সব দোষ চাপাচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অজুহাত দিচ্ছে। তাবৎ বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞরা বিবিধ পন্ডিতি পরামর্শ জাহির করছে। কিন্তু তারা কেউই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনীতির যে ধারা এদেশের বড় বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি তার সূচনা থেকেই অনুসরণ করছে তার উন্মোচন করছে না।

বাস্তবে আজকের সংকট গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো নির্দিষ্ট খাতের সমস্যা নয়। এই সংকটের মূল কারণ কেবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, দুর্নীতি কিংবা কেবলমাত্র কোনো একটি সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি নয়। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে বাংলাদেশের সমগ্র অর্থনীতির সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ নির্ভর চরিত্র। বিগত ৫৫ বছরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা, তৃতীয় শক্তি, জামাত-এনসিপিসহ শাসকশ্রেণির যে গোষ্ঠীই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, তারাই মূলত এই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রেখেছে। কারণ এই ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়েই তারা তাদের শাসন ও গোষ্ঠী-স্বার্থ, ব্যক্তি-স্বার্থ রক্ষা করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রই বিদেশি পুঁজি, প্রযুক্তি, ঋণ, বাজার ও বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক শিল্প এর অন্যতম উদাহরণ। দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস এই শিল্প। কিন্তু এর কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, বাজার এবং অর্থায়নের বড় অংশই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর। এদেশের মালিকগোষ্ঠী মধ্যসত্ত্বভোগী মাত্র। আজ যদি মার্কিনি ট্রাম্প বলে যে, গার্মেন্ট পণ্যের উপর ১০০ ভাগ শুল্ক আরোপ করা হবে, তাহলে সমগ্র দেশ এক সমূহ বিপর্যয়ে পড়তে বাধ্য হবে। অন্য একটি প্রধান খাত আদম-রফতানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এমনকি কৃষির ক্ষেত্রটিও একইরকম। যদি সাম্রাজ্যবাদীদের দয়ায় ও শর্তে শিগগিরই জ্বালানির সংকট মোচন না হয় তাহলে আসন্ন বোরো আবাদে সেটা কতটা ভয়ংকর প্রভাব ফেলবে তা ভাবা কঠিন। এ ধরনের অর্থনীতি চালালে সাম্রাজ্যবাদের বিবিধ দেশ-বিরোধী শর্ত মানতে যেকোনো সরকার বাধ্য। এবং এসব সরকারকে নিজ শর্ত মানতে বাধ্য করা বা প্রয়োজনে ফেলে দেয়া সাম্রাজ্যবাদীদের এক পরীক্ষিত কৌশল। 

বাংলাদেশে বিপুল গ্যাস, কয়লা, সৌরশক্তি, পানি ও জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শাসকশ্রেণি এসব সম্পদকে জনগণের স্বার্থে ও প্রয়োজনে জাতীয় উৎপাদন শক্তির উপর নির্ভর করে আত্মনির্ভরশীলভাবে বিকশিত করার পদক্ষেপ নেয়নি। বরং রাষ্ট্র ক্রমাগত বিদেশি ঋণ, প্রযুক্তি ও কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। বাংলাদেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর অনুসন্ধান-উৎপাদনও সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর করে রাখা হয়েছে। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদনের উপর জোর না দিয়ে বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত গ্যাস) আমদানি-নির্ভর করে ফেলেছে। ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো শুধু পুঁজি বা প্রযুক্তি দিয়ে বিপুল মুনাফা লুটেই ক্ষান্ত হয় না; তারা নিজেদের স্বার্থে গণবিরোধী শর্তও আরোপ করে। সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর শাসকশ্রেণি-রাষ্ট্র সেই শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। না হলে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। 

আওয়ামী সরকার রামপাল বা আদানি থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করেছিল ভারতকে সন্তুষ্ট করতে। এবং নিজেদের ফ্যাসিবাদী ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করার জন্য। ভারত এমনিতেই হাসিনাকে সমর্থন দেয়নি। হাসিনা সরকার কুইক রেন্টালের ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে তার দালাল ব্যবসায়ী ও আমলাদেরকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এগুলো বন্ধ করার সামর্থ এই শাসক বুর্জোয়াদের আছে কি? এক রূপপুর পারমাণবিক বিদুৎ কেন্দ্র করা হয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকার বাজেটে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার সব শর্ত মেনে। এর সাথে জড়ানো রয়েছে দেশের ভয়াবহ পরিবেশ ঝুঁকির আশঙ্কা। এসব বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ কী? জামাত-এনসিপি-বুদ্ধিজীবীদের কর্মসূচি কী? কিছুই না। সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভরতা ও দালালি অব্যাহত রাখা ও তাদের সাথে আপস করা ব্যতীত।

এবারের এলএনজি সংকটের একটা বড় কারণ ছিল ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে রহস্যজনক অগ্নিকান্ড। দুটো মাত্র টার্মিনালের একটি আমেরিকার মালিকানায়, আরেকটি আওয়ামী মালিকানায়। তারা কি বসে বসে আঙুল চুষবে? এ সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে চীন থেকে নতুন টার্মিনাল করবে। চীন কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের থেকে ভালো কিছু? নাকি এটা করলে মার্কিন তার নতুন কোনো চাল দেবে না?

এখানেই নিহিত রয়েছে দেশের অর্থনীতির মূল সংকট। বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটেরও মূল এখানেই। 

একটি দেশের অর্থনীতি যদি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে গড়ে না উঠে, বিদেশি নির্ভরতায় যতই বড় প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি কিংবা উন্নয়নের গল্প বলা হোক না কেন, সামান্য বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা বাজারের অস্থিরতা কিংবা বিদেশি পুঁজির শর্ত পরিবর্তন হলেই সেই অর্থনীতির ভিত নড়ে উঠবে– এটাই স্বাভাবিক। 

বিগত ৫৫ বছরে ক্ষমতার পালাবদল করা শাসকশ্রেণির বিভিন্ন দল ও সরকার সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। কেউ উন্নয়ন, কেউ সংস্কার, বর্তমানে নতুন প্ল্যানের প্রবক্তা বিএনপি সরকারও অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তির বড় কোনো পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম নয়। জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট বা বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির অন্য কোনো দল ক্ষমতায় গেলেও জাতীয় অর্থনীতির সংকট কেটে যাবে না। গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি-সার সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সমাধান হয়ে যাবে না। তারাও একই কর্মসূচি নিতে বাধ্য, কারণ তারা সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্ত বিদ্যমান ব্যবস্থারই অংশ, তারই দালাল।

 সুতরাং দেশের অর্থনীতির সংকট কাটাতে হলে দেশের খনিজ সম্পদ, পানি, সৌরশক্তি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদকে জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আত্মনির্ভরশীলভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রাসারণবাদ মুক্ত অর্থনীতি। আর তারই প্রয়োজনে সবার আগে দরকার সকল সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে দেশ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা, অর্থাৎ সত্যিকারের বিপ্লব করা। তাদের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি বাতিল করা, তাদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা। কিন্তু সেটা দালাল শাকশ্রেণি তথা আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব হবে না।

কিন্তু এটাও সত্য যে সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর এ অর্থনীতি থেকে দেশকে মুক্ত করাটা সহজ কোনো কাজ নয়। সেটা করতে গেলে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের ষড়যন্ত্র হামলে পড়বে। তারা তাদের এদেশীয় দালাল ব্যবসায়ী আমলা রাজনীতিক নেতাদের দ্বারা ব্যাপক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে সক্ষম। তারা এজন্য জনগণকেও তাদের স্বার্থে খেপিয়ে তুলতে সক্ষম। এমনকি সামরিক আক্রমণও তারা করতে পারে। 

কিন্তু জনগণেরও রয়েছে অসীম ধৈর্য, সাহস, উদ্ভাবনী শক্তি ও লড়াকু চেতনা। তারা যদি সত্যিই রাষ্ট্র-ক্ষমতা হাতে পান এবং তার যে বিপ্লবী কর্মসূচি তাতে তারা সজ্জিত থাকেন, তার উৎস যে আদর্শ সমাজতন্ত্র-মার্কসবাদ, তাতে শিক্ষিত থাকেন, তাহলে সব বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব। প্রকৃত বিপ্লব এক অপরাজেয় বিপ্লবী জনগণকেও সৃষ্টি করে। সেটা শাসকশ্রেণির কোনো না কোনো গোষ্ঠীর মদদপ্রাপ্ত কোনো তথাকথিত বিপ্লব দিয়ে ও তাদের পালিত কোনো রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা সম্ভব নয়। ফলে চলমান অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভরতাকে কাটানোর প্রশ্ন আসে না। সংকট সমাধানে তাদের হাতিয়ার হলো সাম্রাজ্যবাদের এই গোষ্ঠী বা ঐ গোষ্ঠীর শর্ত, দাবি, চাপের কাছে নত হয়ে তা মেনে নেয়া। জনগণকে এ সম্পর্কে সচেতন হয়েই জ্বালানি সমস্যার প্রকৃত সমাধানের জন্য বিপ্লবের পথে নিজেদের কাজকে এগিয়ে নিতে হবে।

বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি সংকট :

সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট জনগণ

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

আজকের আধুনিক যুগে গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি হলো জীবন-নির্বাহের এক অপরিহার্য ও অন্যতম প্রধান জীবন-প্রবাহ। সাম্রাজ্যবাদীরা, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা ও তাদের দালাল বড় বুর্জোয়া শ্রেণি নিজেদের মুনাফার স্বার্থে তাকে আরো ব্যাপক করে তুলেছে। এ অবস্থায় যখন দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করে, তখন বুঝতে হবে দেশ ও জনগণের এই শত্রুরা তাদের অর্থনৈতিক নীতি দ্বারা দেশকে সংকটের কোন গহ্বরে নিয়ে ফেলেছে। 

গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়েছে, চালু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়া এবং এ সবের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনগণের জীবন-যাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবহণ, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, এবং হাজার হাজার শ্রমিক-শ্রমজীবী জনগণ বেকার হচ্ছেন, কৃষকের ফসল উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এ অবস্থার জন্য তারা একে অন্যকে দায়ী করছে। জামাত-এনসিপি এ সুযোগে বিএনপি সরকারের বিরোধিতা করে নিজেদের ক্ষমতা-দখলের ষড়যন্ত্র আরো পাকিয়ে তোলার মওকা পাচ্ছে। বিএনপি অতীত আওয়ামী সরকারের উপর সব দোষ চাপাচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অজুহাত দিচ্ছে। তাবৎ বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞরা বিবিধ পন্ডিতি পরামর্শ জাহির করছে। কিন্তু তারা কেউই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনীতির যে ধারা এদেশের বড় বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি তার সূচনা থেকেই অনুসরণ করছে তার উন্মোচন করছে না।

বাস্তবে আজকের সংকট গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো নির্দিষ্ট খাতের সমস্যা নয়। এই সংকটের মূল কারণ কেবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, দুর্নীতি কিংবা কেবলমাত্র কোনো একটি সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি নয়। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে বাংলাদেশের সমগ্র অর্থনীতির সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ নির্ভর চরিত্র। বিগত ৫৫ বছরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা, তৃতীয় শক্তি, জামাত-এনসিপিসহ শাসকশ্রেণির যে গোষ্ঠীই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, তারাই মূলত এই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রেখেছে। কারণ এই ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়েই তারা তাদের শাসন ও গোষ্ঠী-স্বার্থ, ব্যক্তি-স্বার্থ রক্ষা করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রই বিদেশি পুঁজি, প্রযুক্তি, ঋণ, বাজার ও বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাক শিল্প এর অন্যতম উদাহরণ। দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস এই শিল্প। কিন্তু এর কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, বাজার এবং অর্থায়নের বড় অংশই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর। এদেশের মালিকগোষ্ঠী মধ্যসত্ত্বভোগী মাত্র। আজ যদি মার্কিনি ট্রাম্প বলে যে, গার্মেন্ট পণ্যের উপর ১০০ ভাগ শুল্ক আরোপ করা হবে, তাহলে সমগ্র দেশ এক সমূহ বিপর্যয়ে পড়তে বাধ্য হবে। অন্য একটি প্রধান খাত আদম-রফতানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এমনকি কৃষির ক্ষেত্রটিও একইরকম। যদি সাম্রাজ্যবাদীদের দয়ায় ও শর্তে শিগগিরই জ্বালানির সংকট মোচন না হয় তাহলে আসন্ন বোরো আবাদে সেটা কতটা ভয়ংকর প্রভাব ফেলবে তা ভাবা কঠিন। এ ধরনের অর্থনীতি চালালে সাম্রাজ্যবাদের বিবিধ দেশ-বিরোধী শর্ত মানতে যেকোনো সরকার বাধ্য। এবং এসব সরকারকে নিজ শর্ত মানতে বাধ্য করা বা প্রয়োজনে ফেলে দেয়া সাম্রাজ্যবাদীদের এক পরীক্ষিত কৌশল। 

বাংলাদেশে বিপুল গ্যাস, কয়লা, সৌরশক্তি, পানি ও জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু শাসকশ্রেণি এসব সম্পদকে জনগণের স্বার্থে ও প্রয়োজনে জাতীয় উৎপাদন শক্তির উপর নির্ভর করে আত্মনির্ভরশীলভাবে বিকশিত করার পদক্ষেপ নেয়নি। বরং রাষ্ট্র ক্রমাগত বিদেশি ঋণ, প্রযুক্তি ও কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। বাংলাদেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর অনুসন্ধান-উৎপাদনও সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর করে রাখা হয়েছে। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদনের উপর জোর না দিয়ে বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত গ্যাস) আমদানি-নির্ভর করে ফেলেছে। ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো শুধু পুঁজি বা প্রযুক্তি দিয়ে বিপুল মুনাফা লুটেই ক্ষান্ত হয় না; তারা নিজেদের স্বার্থে গণবিরোধী শর্তও আরোপ করে। সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর শাসকশ্রেণি-রাষ্ট্র সেই শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। না হলে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। 

আওয়ামী সরকার রামপাল বা আদানি থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করেছিল ভারতকে সন্তুষ্ট করতে। এবং নিজেদের ফ্যাসিবাদী ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করার জন্য। ভারত এমনিতেই হাসিনাকে সমর্থন দেয়নি। হাসিনা সরকার কুইক রেন্টালের ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে তার দালাল ব্যবসায়ী ও আমলাদেরকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এগুলো বন্ধ করার সামর্থ এই শাসক বুর্জোয়াদের আছে কি? এক রূপপুর পারমাণবিক বিদুৎ কেন্দ্র করা হয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকার বাজেটে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার সব শর্ত মেনে। এর সাথে জড়ানো রয়েছে দেশের ভয়াবহ পরিবেশ ঝুঁকির আশঙ্কা। এসব বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ কী? জামাত-এনসিপি-বুদ্ধিজীবীদের কর্মসূচি কী? কিছুই না। সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভরতা ও দালালি অব্যাহত রাখা ও তাদের সাথে আপস করা ব্যতীত।

এবারের এলএনজি সংকটের একটা বড় কারণ ছিল ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে রহস্যজনক অগ্নিকান্ড। দুটো মাত্র টার্মিনালের একটি আমেরিকার মালিকানায়, আরেকটি আওয়ামী মালিকানায়। তারা কি বসে বসে আঙুল চুষবে? এ সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে চীন থেকে নতুন টার্মিনাল করবে। চীন কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের থেকে ভালো কিছু? নাকি এটা করলে মার্কিন তার নতুন কোনো চাল দেবে না?

এখানেই নিহিত রয়েছে দেশের অর্থনীতির মূল সংকট। বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটেরও মূল এখানেই। 

একটি দেশের অর্থনীতি যদি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে গড়ে না উঠে, বিদেশি নির্ভরতায় যতই বড় প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি কিংবা উন্নয়নের গল্প বলা হোক না কেন, সামান্য বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা বাজারের অস্থিরতা কিংবা বিদেশি পুঁজির শর্ত পরিবর্তন হলেই সেই অর্থনীতির ভিত নড়ে উঠবে– এটাই স্বাভাবিক। 

বিগত ৫৫ বছরে ক্ষমতার পালাবদল করা শাসকশ্রেণির বিভিন্ন দল ও সরকার সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। কেউ উন্নয়ন, কেউ সংস্কার, বর্তমানে নতুন প্ল্যানের প্রবক্তা বিএনপি সরকারও অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তির বড় কোনো পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম নয়। জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট বা বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির অন্য কোনো দল ক্ষমতায় গেলেও জাতীয় অর্থনীতির সংকট কেটে যাবে না। গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানি-সার সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সমাধান হয়ে যাবে না। তারাও একই কর্মসূচি নিতে বাধ্য, কারণ তারা সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্ত বিদ্যমান ব্যবস্থারই অংশ, তারই দালাল।

 সুতরাং দেশের অর্থনীতির সংকট কাটাতে হলে দেশের খনিজ সম্পদ, পানি, সৌরশক্তি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদকে জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আত্মনির্ভরশীলভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রাসারণবাদ মুক্ত অর্থনীতি। আর তারই প্রয়োজনে সবার আগে দরকার সকল সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে দেশ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা, অর্থাৎ সত্যিকারের বিপ্লব করা। তাদের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি বাতিল করা, তাদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা। কিন্তু সেটা দালাল শাকশ্রেণি তথা আমলা-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব হবে না।

কিন্তু এটাও সত্য যে সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর এ অর্থনীতি থেকে দেশকে মুক্ত করাটা সহজ কোনো কাজ নয়। সেটা করতে গেলে সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের ষড়যন্ত্র হামলে পড়বে। তারা তাদের এদেশীয় দালাল ব্যবসায়ী আমলা রাজনীতিক নেতাদের দ্বারা ব্যাপক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে সক্ষম। তারা এজন্য জনগণকেও তাদের স্বার্থে খেপিয়ে তুলতে সক্ষম। এমনকি সামরিক আক্রমণও তারা করতে পারে। 

কিন্তু জনগণেরও রয়েছে অসীম ধৈর্য, সাহস, উদ্ভাবনী শক্তি ও লড়াকু চেতনা। তারা যদি সত্যিই রাষ্ট্র-ক্ষমতা হাতে পান এবং তার যে বিপ্লবী কর্মসূচি তাতে তারা সজ্জিত থাকেন, তার উৎস যে আদর্শ সমাজতন্ত্র-মার্কসবাদ, তাতে শিক্ষিত থাকেন, তাহলে সব বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব। প্রকৃত বিপ্লব এক অপরাজেয় বিপ্লবী জনগণকেও সৃষ্টি করে। সেটা শাসকশ্রেণির কোনো না কোনো গোষ্ঠীর মদদপ্রাপ্ত কোনো তথাকথিত বিপ্লব দিয়ে ও তাদের পালিত কোনো রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা সম্ভব নয়। ফলে চলমান অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভরতাকে কাটানোর প্রশ্ন আসে না। সংকট সমাধানে তাদের হাতিয়ার হলো সাম্রাজ্যবাদের এই গোষ্ঠী বা ঐ গোষ্ঠীর শর্ত, দাবি, চাপের কাছে নত হয়ে তা মেনে নেয়া। জনগণকে এ সম্পর্কে সচেতন হয়েই জ্বালানি সমস্যার প্রকৃত সমাধানের জন্য বিপ্লবের পথে নিজেদের কাজকে এগিয়ে নিতে হবে।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র